ভূমিকম্প সহনশীল ভবন ডিজাইন: নীতিমালা ও কৌশল
ভূমিকা: ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। ইন্ডিয়ান প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় আমাদের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বা সচেতন নাগরিক হিসেবে "ভূমিকম্প সহনশীল ভবন" (Earthquake Resistant Building) তৈরির মূলনীতিগুলো জানা এখন সময়ের দাবি।
১. বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি ও সিসমিক জোন
বিএনবিসি (BNBC 2020) অনুযায়ী বাংলাদেশকে মূলত ৪টি সিসমিক জোনে ভাগ করা হয়েছে। মাটির ধরন এবং চ্যুতির (Fault Line) অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এই জোনগুলো নির্ধারণ করা হয়।
- জোন-১ (লো রিস্ক): দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল (যেমন: খুলনা, বরিশাল)।
- জোন-২ ও ৩ (মাঝারি ও উচ্চ রিস্ক): ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা।
- জোন-৪ (সর্বোচ্চ রিস্ক): সিলেট ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল। এই জোনের জন্য ভবন ডিজাইনে বিশেষ সতর্কতা (Special Detailing) প্রয়োজন।
২. স্ট্রাকচারাল সিস্টেম: ফ্রেম নাকি শিয়ার ওয়াল?
ভূমিকম্পের সময় ভবনের ওপর হরাইজন্টাল বা আড়াআড়ি লোড (Lateral Load) আসে। এই লোড মোকাবিলার জন্য আমরা ৩টি প্রধান সিস্টেম ব্যবহার করি:
Moment Resisting Frame (MRF)
সাধারণ কলাম-বিম স্ট্রাকচার। এখানে কলাম ও বিমের সংযোগস্থল (Joints) এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যেন তা নমনীয় হয় এবং শক্তি শোষণ করতে পারে।
Shear Wall System
এটি কনক্রিটের শক্ত দেওয়াল যা লিফট কোর বা সিঁড়ির পাশে থাকে। এটি ভূমিকম্পের ধাক্কা সরাসরি মাটিতে স্থানান্তর করতে অত্যন্ত কার্যকর।
Dual System
সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। এখানে ফ্রেম এবং শিয়ার ওয়াল—উভয়ই লোড শেয়ার করে। বহুতল ভবনের জন্য এটি এখন স্ট্যান্ডার্ড।
৩. সিসমিক ডিজাইনের গোল্ডেন রুলস
ভবন তৈরির সময় কিছু বিশেষ কৌশল অবলম্বন করলে তা ভূমিকম্পে ধসে পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
ক. ডাক্টিলিটি (Ductility) নিশ্চিত করা
ডাক্টিলিটি হলো ভবনের বাঁকানোর ক্ষমতা। ভূমিকম্পে ভবন দুলবে, কিন্তু ভেঙে পড়বে না। এটি নিশ্চিত করতে:
- বিম এবং কলামের জয়েন্টে রডের পরিমাণ সঠিক রাখা।
- কলামে টাই বা রিং (Stirrups) ঘন ঘন দেওয়া (বিশেষ করে জয়েন্টের কাছে)।
- 'Strong Column - Weak Beam' ফিলোসফি মেনে চলা।
খ. সফট স্টোরি (Soft Story) এড়ানো
বাংলাদেশের অনেক ভবনের নিচতলা বা গ্রাউন্ড ফ্লোর গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য খালি রাখা হয় এবং কোনো ওয়াল দেওয়া হয় না। একে Soft Story বলা হয়। ভূমিকম্পের সময় অধিকাংশ ভবন এই নিচতলা থেকেই ভেঙে পড়ে। এর সমাধান হিসেবে নিচতলায় অতিরিক্ত শক্তিশালী কলাম বা শিয়ার ওয়াল দিতে হবে।
গ. বেইজ আইসোলেশন (Base Isolation)
এটি একটি আধুনিক প্রযুক্তি যেখানে ভবনের ফাউন্ডেশন এবং সুপারস্ট্রাকচারের মাঝে রাবার বা স্প্রিং-এর প্যাড বসানো হয়। ফলে ভূমিকম্পের সময় মাটি কাঁপলেও ভবন স্থির থাকে। পদ্মা সেতুর বিয়ারিং অনেকটা এভাবেই কাজ করে।
[attachment_0](attachment)৪. নির্মাণকালীন সাধারণ ভুলসমূহ
ডিজাইন সঠিক থাকলেও কনস্ট্রাকশন সাইটে ভুলের কারণে ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
- ল্যাপিং জোন (Lapping Zone) ভুল জায়গায় দেওয়া (যেমন: কলামের মাঝখানের বদলে গোড়ায় বা বিমের জয়েন্টে)।
- কংক্রিটের মিক্স রেশিও ঠিক না রাখা এবং কিউরিং না করা।
- মাটি পরীক্ষা (Soil Test) না করেই ফাউন্ডেশনের গভীরতা নির্ধারণ করা।
৫. ভবিষ্যৎ ও রেট্রোফিটিং
পুরাতন ভবন যা ভূমিকম্প সহনশীল নয়, সেগুলোকে Retrofitting বা সংস্কারের মাধ্যমে শক্তিশালী করা সম্ভব। এর মধ্যে Jacketing (কলাম মোটা করা) এবং FRP Wrapping জনপ্রিয় পদ্ধতি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে Performance Based Design বা PBD প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে, যেখানে সুনির্দিষ্ট ভূমিকম্পের মাত্রার বিপরীতে ভবনের আচরণ সিমুলেশন করা হবে।
উপসংহার
ভূমিকম্প আমাদের হাতে নেই, কিন্তু নিরাপদ ভবন নির্মাণ আমাদের হাতে। বিএনবিসি কোড মেনে সঠিক ডিটেইলিং এবং গুণগত মান বজায় রেখে ভবন নির্মাণ করলে রিখটার স্কেলে ৭ বা ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
0 মন্তব্যসমূহ